top of page

জন্মদিন ও একটি বই

  • Feb 12, 2021
  • 3 min read

Updated: May 3, 2022


এমনিতে জন্মদিন ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে একটু গোলমেলে। আমাদের সময়ে মফঃস্বলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ঘটা করে জন্মদিন পালনের খুব একটা রেওয়াজ ছিল বলে আমার মনে হয় না, তবে আমার ক্ষেত্রে দিনটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের অবহেলিত হতো। বেশীর ভাগ বছরই আসল দিনে আমি, মা দুজনেই ভুলে যেতাম , তারপর সপ্তাহ খানেক পরে হয়তো খেয়াল পড়ত আমার। তখন মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দোকান থেকে আমুল চকোলেট বা কোয়ালিটি আইসক্রীম কোন একটা কিনে এনে তারিয়ে তারিয়ে খেতাম। একদিক থেকে বলা যেতে পারে জন্মদিন উদযাপনের ব্যাপারে শৈশবকাল থেকেই আমি আত্মনির্ভর। তবে দ্বাদশ বর্ষীয় জন্মদিনে একটা গড়বড় হয়ে যায়। বাবা সচরাচর দেশ ও দশের সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টায় এতটাই নিমজ্জমান থাকতেন যে আমার লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। আর জন্মদিন তো নিঃশব্দে চলে যেতো। কিন্তু আমার ১২ বছরের জন্মদিন চিরস্মরণীয়, কারন ঐদিন বাবার থেকে আমি উপহার পেলাম একটি বই

“ভূতাত্ত্বিকের চোখে পশ্চিমবাংলা”

বইটি হাতে পেয়ে, বুঝতেই পারছেন, আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। আমি বই এর পোকা, ক্লাস টু তেই চশমা হয়ে গেছে – কিন্তু সে সব তো টান টান উত্তেজনা পূর্ণ কমিক্স আর গল্পের বই, বড় জোর “ছোটদের বুক অব নলেজ”। এমনকি আমার দশ বছরের বড় দাদা যে তখনই সমাজতত্ত্ব, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞানের কঠিন কঠিন বই পড়ে কাগজে, পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখালেখি শুরু করেছে, সেও দেখলাম বইটা উলটে পালটে মুচকি হেসে রেখে দিল। না সে বই আমি পড়ার চেষ্টা করিনি। কিন্তু সেদিন থেকেই জন্মদিন ব্যাপারটাকে আমি একটু সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করি। বাবাও হয়তো বুঝেছিলেন, তাই এর পরের দিকে যদিও কোনো কোনো জন্মদিনে বই উপহার পেয়েছি, সেসব বই নামের দিক দিয়ে অনেক স্বস্তিদায়ক ও তুলনামূলকভাবে সহজপাঠ্য। কিন্তু জন্মদিন সম্পর্কে বালক বয়সের সেই সংশয় রয়েই গেছে। হয়তো সে কারণেই এবং আমার মজ্জাগত অপরিসীম আলস্যে আমার বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজন কাউকেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়ে ওঠে না। তবে ইদানীং অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করে, যেমন ধরুন -

জন্মদিন জিন্দাবাদ!

জন্মদিন চলছে চলবে!

কমরেড জন্মদিন আমরা তোমায় ভুলিনি ভুলছি না!

শ্রদ্ধেয় জন্মদিনের অনুপ্রেরনায় আপনার দুয়ারে শুভেচ্ছা!

জয় শ্রী জন্মদিন!

আত্মনির্ভর সোনার জন্মদিনে আপনাকে স্বাগত!

ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনারা হয়তো বলবেন, এসব তো রাজনৈতিক স্লোগান ঘেঁষা, জন্মদিনে বলা ঠিক নয়। কিন্তু এখন তো সব কিছুই রাজনৈতিক, মনিষীদের জন্মদিন তো বটেই। তাহলে আপনার আমার জন্মদিনই বা বাদ থাকে কেন। তো, যাই হোক পৃথিবীর বার্ষিক গতিজনিত অমোঘ আবর্তনে কাল আমার পঞ্চাশতম জন্মদিন। মিঃ কে সি পাল বেঁচে আছেন কিনা জানিনা , থাকলে আপত্তি জানাতে পারেন। বাকিরা নিশ্চয়ই একমত হবেন। বাবা চলে গেছেন পাঁচ বছর আগে। মা এখনো যথারীতি ভুলে যান। জন্মদিনে তাই এখনো আত্মনির্ভরতাই আমার পছন্দ। চকোলেটের ব্যবস্থা করে ফেলেছি। এই ছুতোয় প্রতি বছর মনোমতো কিছু বইও কিনে থাকি। এবছর ভাবছি বই আর কিনব না। বহুকাল হলো, সংশয়ী মন জন্মদিন ছাড়িয়ে প্রতিদিনের জীবনযাপনের নিত্যসঙ্গী। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের মহাযজ্ঞে মন এখন সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত। দাদা-ভাই, বাবা-ছেলে, পিসি ভাইপো, হবুচন্দ্র গবুচন্দ্র এবং তাদের অসংখ্য ছোট বড় পাত্র, মিত্র, অমাত্য সকলেরই পাখির চোখ এখন ক্ষমতার সিংহাসন, সকলেই সেই পবিত্র উদ্দেশ্যে হাসি হাসি মুখে হাত জোড় করে দেখছেন আমাকে আপনাকে। তাঁদের বিশাল বিশাল প্রতিকৃতিতে ঢাকা পড়ে গেছে বাংলার শরীর। এসব দেখে শুনে এতদিনের না পড়া বইটা এবার পড়ব ঠিক করেছি। এই সর্বব্যাপী ক্ষমতালোভী চোখের বিপ্রতীপে, এই পঞ্চাশতম জন্মদিনে, আটত্রিশ বছর আগে বাবার কাছ জন্মদিনে পাওয়া ভূতাত্ত্বিকের চোখে দেখা পশ্চিমবাংলাই আমার পরম উপহার।

১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

পরিশিষ্ট

ভূতাত্ত্বিকের চোখে পশ্চিমবাংলা বইটির লেখক সঙ্কর্ষণ রায় (১৯২৮-২০১৭)। পেশায় ছিলেন ভূবিজ্ঞানী, নেশায় সাহিত্যিক। জিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অধিকর্তা ছিলেন। অবসর নেন ১৯৮৬ সালে। ভূবিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সরস, আকর্ষক করে পেশ করার কাজে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। প্রবন্ধকে গল্পের ছলে পেশ করে তার নাম দেন ‘প্রগল্প’। শুধু মাটি আর খনিজ নয়, মাটির নীচের সেই সম্পদকে কেন্দ্র করে যে আরণ্যক জীবন, সঙ্কর্ষণ রায়ের কলম বেয়ে সেই মানুষ ও পশুপাখির কথাও প্রবেশ করেছিল বাংলা সাহিত্যে। ১৯৮৩ সালে ভূতাত্ত্বিকের চোখে পশ্চিমবাংলা বইটির জন্য পেয়েছিলেন রবীন্দ্র পুরস্কার।


সাহায্যসুত্র ও ঋণস্বীকার


Comments


Anchor 1
bottom of page